নারী উদ্যোক্তা ও অনানুষ্ঠানিক খাতের কর্মজীবীদের উপর কোভিড-১৯ এর প্রভাব

কোভিড-১৯ এর প্রভাবে আয়ের সুযোগ হারিয়েছেন বেশিরভাগ নারী উদ্যোক্তা ও অনানুষ্ঠানিক খাতের কর্মজীবী নারী। ফলে এদের বেশিরভাগই পারিবারিক সহিংসতা, ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস, উদ্বেগসহ বিভিন্ন অর্থনৈতিক ও মানসিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছেন। তবু আবার ঘুরে দাঁড়ানোর প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন তাঁরা।

"কোভিড ১৯ মহামারীতে কুটির, অতি ক্ষুদ্র, মাঝারি ও কুটির-শিল্প উদ্যোক্তা এবং অনানুষ্ঠানিক খাতের কর্মজীবী নারীদের অবস্থা" শীর্ষক এক দ্রুত সমীক্ষার ফলাফল প্রকাশে আয়োজিত ব্র্যাক সংলাপ "কাজে ও ব্যবসায় ক্ষতিগ্রস্ত নারী" অনুষ্ঠানে এই তথ্য উঠে আসে। আজ বৃহস্পতিবার (১৭ই সেপ্টেম্বর) এই ডিজিটাল আলোচনার আয়োজন করা হয়। ব্র্যাকের জেন্ডার জাস্টিস অ্যান্ড ডাইভারসিটি প্রোগ্রামের উদ্যোগে অ্যাডভোকেসি ফর সোশ্যাল চেঞ্জ প্রোগ্রাম এই সমীক্ষাটি পরিচালনা করে।

ব্র্যাকের পরিচালক নবনীতা চৌধুরীর সঞ্চালনায় এই ব্রিফিংয়ে প্রধান অতিথি ছিলেন শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিব আবদুস সালাম। প্যানেল বক্তা হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ইউসেপ বাংলাদেশ-এর চেয়ারপারসন পারভিন মাহমুদ, বিজনেস ইনিশিয়েটিভ লিডিং ডেভেলপমেন্ট-এর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ফেরদৌস আরা বেগম, কর্মজীবী নারীর নির্বাহী পরিচালক রোকেয়া রফিক, তরঙ্গ-এর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা কোহিনূর ইয়াসমিন, অর্থনীতিবিদ নাজনীন আহমেদ, ব্র্যাকের নির্বাহী পরিচালক আসিফ সালেহ , ঊর্ধ্বতন পরিচালক শামেরান আবেদ। সমীক্ষার ফলাফল উপস্থাপন করেন ব্র্যাকের ঊর্ধ্বতন পরিচালক কেএএম মোর্শেদ।

সমীক্ষায় দেখা গেছে, কোভিড-১৯ এর কারণে উদ্যোক্তাদের ৬৫ শতাংশেরই কোনো উপার্জন নেই। এ মহামারির সংক্রমণ ঠেকাতে সরকার ঘোষিত ছুটি ও বিভিন্ন সিদ্ধান্ত আরোপের ফলে গত ফেব্রুয়ারি থেকে জুন মাস পর্যন্ত অনানুষ্ঠানিক খাতে কর্মরত নারীদের ৫৮ শতাংশই কাজের সুযোগ হারিয়েছেন। উদ্যোক্তাদের ৬৭ ভাগ আয় কমে গেছে, অনানুষ্ঠানিক খাতে কর্মজীবীদের আয় কমেছে ৬৬ ভাগ। এর ফলে ৯০ ভাগ নারী উদ্যোক্তা এবং ৮৪ ভাগ অনানুষ্ঠানিক খাতের কর্মজীবী নারী সামাজিক, অর্থনৈতিক ও মানসিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছেন।

গত ৮ই জুলাই থেকে ২৪শে জুলাই দেশের ২৮ জেলার ১৭৪টি উপজেলায় জরিপটি পরিচালিত হয়। মোট ১ হাজার ৫৮৯ জন নারী এতে অংশ নেন, যার মধ্যে ৫৮৯ জন উদ্যোক্তা এবং ১ হাজার জন কর্মী। অংশগ্রহণকারীদের ৩২ ভাগ হলেন গ্রামীণ নারী, বাকি ৬৮ ভাগ শহরাঞ্চলের।

সমীক্ষায় উঠে আসে- এই দুর্যোগকালে উদ্যোক্তাদের ৩৩ শতাংশই তাদের ব্যবসায় উদ্যোগ বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়েছেন, ৪১ ভাগ উদ্যোক্তা কর্মীদের কর্মবিরতিতে (লে অফ) পাঠিয়েছেন। ৮৬ শতাংশ উদ্যোক্তা জানিয়েছেন, ব্যবসায়িক সংকটগুলোর সঙ্গে মানিয়ে নিতে তাঁরা কোনো ব্যবস্থাই নিতে পারেননি। কর্মজীবী নারীদের ৩৯ শতাংশ বলেছেন-টিকে থাকার জন্য আত্মীয়স্বজন ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের কাছ থেকে তাঁদের ঋণ নিতে হয়েছে।

মহামারির এই সময়টাতে পরিবার থেকেই নানা সমস্যার মুখোমুখি হওয়ার কথা বলেছেন ৪৬ ভাগ উদ্যোক্তা আর ৭২ ভাগ কর্মজীবী নারী, যাদের বেশিরভাগই তীব্র মানসিক চাপে ভুগেছেন বলে জানান।

এতে দেখা গেছে, ফেব্রুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত উদ্যোক্তাদের ব্যবসায়ে মাথাপিছু গড়ে লোকসান হয়েছে ২ লাখ ৮৯ হাজার ৬০৫ টাকা।

ব্যবসায় উদ্যোগগুলোর জন্য সরকারের প্রণোদনা প্যাকেজ এই উদ্যোক্তাদের ক্ষেত্রে কার্যত ব্যর্থ হয়েছে। এদের মাত্র ২৯ শতাংশ এই প্রণোদনার খবর জানতেন। বেশিরভাগ উদ্যোক্তাই তাদের ব্যবসায়ের জন্য এনজিওগুলোর ঋণ সহায়তাকেই বেছে নিয়েছেন।

অনানুষ্ঠানিক খাতের কর্মজীবীদের জন্য সামাজিক নিরাপত্তা সেবাও অপ্রতুল বলে জানা গেছে। ফেব্রুয়ারী থেকে জুন পর্যন্ত যারা উপার্জনহীন ছিলেন, তাদের মধ্যে গ্রাম এলাকার ৭২ ভাগ এবং শহরের ৪৯ ভাগ বলেছেন- সরকার, এনজিও বা বেসরকারি কোনো খাত থেকেই তারা কোনোরকম সহায়তা পাননি।

এই সমীক্ষার উল্লেখযোগ্য ফলাফল হচ্ছে, এতসব সমস্যার পরেও এই নারী উদ্যোক্তা ও কর্মজীবীরা আবার ঘুরে দাঁড়ানোর প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন। এজন্যে ৮৩ শতাংশ কর্মজীবী নারী আর্থিক সহায়তা চান আর ৭৯ শতাংশ উদ্যোক্তা সহজ শর্তে ও অল্প সুদে ঋণ পেতে চান। এর পাশাপাশি দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণও চান বেশিরভাগ উত্তরদাতা।আশার কথা হচ্ছে, মাত্র ১ শতাংশ তাদের আগের কাজ ও ব্যবসা উদ্যোগ ছেড়ে দেওয়ার কথা ভাবছেন।

আয়োজনে বক্তারা যা বললেনঃ শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিব আবদুস সালাম বলেন, "সরকারের পরিকল্পনা গ্রহণেও কৌশলগত পরিবর্তন আসছে। কৃষি, শিল্পসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিশাল প্রণোদনা দেওয়া হচ্ছে। কর্মসংস্থান ব্যাংকসহ আরও কিছু ব্যাংক ঋণদান করছে। আশা করি, ডিসেম্বরের মধ্যেই এই অভাবের চিত্রটা পালটে যাবে। আমরা আবার উঠে দাঁড়াব।"

অর্থনীতিবিদ নাজনীন আহমেদ বলেন, "কুটিরশিল্প ও অতি ক্ষুদ্র ব্যবসা উদ্যোক্তা এবং কর্মীদের এই গবেষণায় আলাদা গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে -এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশে সামগ্রিকভাবে খানাজরিপ করা হলে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা এবং অনানুষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকদের তালিকাসহ প্রতিটি ক্ষেত্রেই প্রকৃত চিত্র পাওয়া যেত। এখন প্রয়োজনে এনজিওর মাধ্যমে এদের প্রণোদনা বিতরণ করার উদ্যোগ নিলে এ সমস্যা মোকাবেলা সহজ হবে।"

ব্র্যাকের নির্বাহী পরিচালক আসিফ সালেহ বলেন, "আমরা যদি গত চার পাঁচমাসে দেখা দেওয়া সঙ্কটগুলো কাটিয়ে উঠার সংকল্প নিই, যেমন- যথাসময়ে যথাস্থানে সহায়তা পৌঁছানো, নারীর প্রতি সহিংসতা ও স্কুলশিক্ষার্থীদের ঝরে পড়া রোধ করা গেলে আমরা অবশ্যই অবস্থার উন্নতি করব। নারীর মতো প্রান্তিক জনগোষ্ঠী যেন এই সংকটে আরও প্রান্তিক না হয়ে পড়েন, সেই লক্ষ্যে আমাদের সরকার, সামাজিক সংগঠন ও এনজিওদের একত্রে কাজ করতে হবে।"

ব্র্যাকের ঊর্ধ্বতন পরিচালক শামেরান আবেদ বলেন, "ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা নারীরা ব্যাংকের মতো প্রতিষ্ঠান থেকে সাধারণত ঋণ পান না। আর কুটির ও অতি ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা তো ব্যাংকে যেতেই পারেন না। এনজিওগুলোকে এ দিকে নজর দিতে হবে, কিন্তু তাদেরও অনেক সীমাবদ্ধতা আছে। সরকারি-বেসরকারি উভয়দিকেই সমন্বিত উদ্যোগে এর সমাধান খুঁজতে হবে।"

ইউসেপ বাংলাদেশ-এর চেয়ারপারসন পারভিন মাহমুদ বলেন, "নিউ নরমালে টিকে যাওয়ার জন্যে নারীদের ব্যবসা ব্যবস্থাপনায় বদল আনার জন্যে সক্ষমতা এবং দক্ষতার প্রশিক্ষণ দেওয়া দরকার। আমাদের সরকারের পলিসিতে থাকলেও মাইক্রো ইন্স্যুরেন্সের সুযোগ নাই আমাদের দেশে। আমি মনে করি, কটেজ এবং মাইক্রো শিল্প উদ্যোগের নিরাপত্তার জন্যে মাইক্রো ইন্স্যুরেন্সের সুযোগ থাকা খুবই জরুরি।"

বিজনেস ইনিশিয়েটিভ লিডিং ডেভেলপমেন্ট-এর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ফেরদৌস আরা বেগম বলেন, "এরকম বড় সংখ্যায় সুনির্দিষ্ট সেক্টর ধরে বিশেষভাবে কটেজ ও মাইক্রো শিল্প উদ্যোক্তাদেরও অন্তর্ভুক্ত করে কোভিডের সময় আর কোন গবেষণা হয়েছে বলে মনে হয় না। নানারকম বাধা তো আছেই, তবে, আমরা বিশেষভাবে কুটির ও অতি ক্ষুদ্র এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্যে কোন কোল্যাটারাল ছাড়া ঋণ সুবিধার ব্যবস্থা করার পরামর্শ নিয়ে আমরা প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে আমাদের যে ১৩ জন সচিবের সঙ্গে আন্তঃ মন্ত্রণালয় পরামর্শ সভা করার সুযোগ হয়, সেখানেও কথা বলব। আমরা মনে করি, ঋণ দেওয়ার বিধিমালাও কুটির, অতি ক্ষুদ্র ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্যে পরিবর্তন করা দরকার। বাংলাদেশ ব্যাংকও সম্প্রতি এ বিষয়ে উদ্যোগ নিয়েছে। কারণ এই খাতগুলোই কিন্তু আমাদের প্রায় দেড় কোটি মানুষের কর্মসংস্থান করে।"

কর্মজীবী নারীর নির্বাহী পরিচালক রোকেয়া রফিক বলেন, "অনানুষ্ঠানিক খাতের কর্মীদের সহায়তায় সরকারি বেসরকারি তেমন কোন সমন্বিত উদ্যোগ চোখে না পড়লেও দেখা যাচ্ছে তারাই নিজ উদ্যোগে টিকে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। পেশা বদল করে, আগের চেয়ে অনেক কম অর্থের বিনিময়ে শ্রম দিয়ে, পুষ্টিকর কোন খাবার না খেয়ে শুধু ভাত ডাল খেয়ে আর বাচ্চাদের পড়ালেখা যেহেতু বন্ধ সেই খরচটাও বাঁচিয়ে তারা টিঁকে আছেন। তাদের আবার আগের জীবনমানে ফিরিয়ে আনার জন্যে সহায়তা দিতে হবে।"

তরঙ্গ-এর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা কোহিনূর ইয়াসমিন বলেন, "অনেক রপ্তানিমুখী ব্যবসাই আবার ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেছে। যেমন পাটপণ্য উৎপাদকেরাই সবচেয়ে বড় ক্ষতিতে পড়েছিলেন, কিন্তু পরিবেশবান্ধব বলে এখন বিদেশ থেকে এর অনেক চাহিদা আসছে। তবে, বাংলাদেশের উৎপাদকদের বেশিরভাগই বিদেশে রপ্তানি করেন না। তাদেরকে সরকারি বেসরকারি উদ্যোগে স্থানীয় বাজার মুখাপেক্ষী না থেকে বিদেশের বাজারের সঙ্গে সংযুক্ত করার ব্যবস্থা করে দিতে হবে।"

আমাদের কর্মস্থল

                

ব্র্যাক কুইজ

কোনটি দারিদ্র্য দূরীকরনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি কার্যকরী?

বিকল্প যোগাযোগ পন্থা