সমন্বিত উন্নয়ন কর্মসূচিতে অন্তর্ভুক্তির ফলে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর আয় বেড়েছে ৯ শতাংশ

Income-of-deprived-people-rose-9-percent-due-to-integrated-development-interventions

হাওর এলাকায় সমন্বিত উন্নয়ন কর্মসূচির কারণে দরিদ্র মানুষের মাথাপিছু আয় বেড়েছে ৯ শতাংশ। পাশাপাশি ১৫-৬৫ বয়সী নারী ও পুরুষদের আত্মকর্মসংস্থান বেড়েছে যথাক্রমে প্রায় ৬ শতাংশ ও ১০ শতাংশ। এছাড়া চিকিৎসা, শিশু শিক্ষা, খাদ্য ব্যয়, সঞ্চয় প্রবণতা, বিনিয়োগ, জমি ও পোশাক ক্রয়ের ক্ষেত্রে নারীদের অবদান আগের চেয়ে ১৪ শতাংশ বেড়েছে।

আজ বুধবার (১ লা নভেম্বর, ২০১৭) রাজধানীর ব্র্যাক সেন্টারে অনুষ্ঠিত ‘হাওরে ব্র্যাকের কার্যক্রম ও আকস্মিক বন্যা’ শীর্ষক কর্মশালায় গবেষণা প্রতিবেদন উপস্থাপনায় এই তথ্য তুলে ধরা হয়। ব্র্যাকের সমন্বিত উন্নয়ন কর্মসূচি আয়োজিত এই কর্মশালায় অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন পানিসম্পদ মন্ত্রী আনিসুল ইসলাম মাহমুদ এমপি। ব্র্যাকের নির্বাহী পরিচালক ডা. মুহাম্মাদ মুসার সভাপতিত্বে অন্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন ডেনিশ ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট এজেন্সির (ডানিডা) হেড অফ কো-অপারেশন পিটার বগ জেনসেন ও ডিপার্টমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট (ডিএফআইডি) বাংলাদেশ-এর উন্নয়ন ফলাফল ও মূল্যায়ন বিভাগের প্রথম সেক্রেটারি ইউসূফ রফিক, ব্র্যাকের গবেষণা ও মূল্যায়ন বিভাগের পরিচালক প্রফেসর আব্দুল বায়েস, সমন্বিত উন্নয়ন কর্মসূচি, সামাজিক ক্ষমতায়ন ও জেন্ডার জাস্টিস অ্যান্ড ডাইভারসিটি কর্মসূচির পরিচালক আন্না মিনজ প্রমুখ। এছাড়া উপস্থিত ছিলেন সরকারি-বেসরকারি, দাতা সংস্থা, উন্নয়ন গবেষকসহ সংশ্লিষ্ট পর্যায়ের শীর্ষ প্রতিনিধিবৃন্দ। 

সুবিধাবঞ্চিত হাওরবাসী, চর ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে আদিবাসী জনগোষ্ঠীকে উন্নয়নের মূল ধারায় সম্পৃক্ত করা এবং জীবনযাত্রার মান বৃদ্ধির লক্ষ্যে ২০১৩ সালে সমন্বিত উন্নয়ন কর্মসূচি গ্রহণ করে ব্র্যাক। এর আগে ২০১২ সালের জানুয়ারি মাসে মোট ১৬টি উপজেলায় ৭ হাজার ৭৮৩ টি পরিবারের ওপর প্রাথমিক জরিপ শুরু হয়। জরিপটি শেষ হয় ২০১৬ সালের এপ্রিলে।

‘দারিদ্র্য হ্রাস ও প্রতিকূলতা মোকাবেলায় নতুন মডেল: ব্র্যাকের সমন্বিত উন্নয়ন কর্মসূচির ফলাফল উপস্থাপন’ শীর্ষক প্রথম গবেষণা প্রতিবেদনটি উপস্থাপন করেন ব্র্যাকের গবেষণা ও মূল্যায়ন বিভাগের উন্নয়ন অর্থনীতি ইউনিটের রিসার্চ ফেলো জিন্নাত আরা। গবেষণায় উল্লেখ করা হয়, ৭ হাজার ৭৮৩ টি পরিবারের মধ্যে ৫হাজার ১৮৩টি পরিবার সমন্বিত উন্নয়ন কর্মসূচির অন্তর্ভুক্ত ছিল। অপরদিকে ২হাজার ৬০০ টি পরিবার এই সুবিধা পায়নি। জরিপ শেষে দেখা যায়, প্রকল্পের সুবিধাভোগীদের ক্ষেত্রে স্বাস্থ্যসম্মত পায়খানা ব্যবহার এবং প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত চিকিৎসকের কাছ থেকে স্বাস্থ্যসেবা নেওয়ার হার যথাক্রমে ৭৭ শতাংশ ও ৫০ শতাংশ বেড়েছে।

এতে আরও বলা হয়, প্রকল্পে অন্তর্ভুক্তদের মধ্যে ৬৩ শতাংশের খাদ্য নিরাপত্তা ছিল, পক্ষান্তরে যারা এই সুবিধা পাননি তাদের ক্ষেত্রে খাদ্য নিরাপত্তা ছিল ৪৬ শতাংশ। প্রকল্পের সুবিধার বাইরে যেখানে নারীদের আত্মকর্মসংস্থান ছিল ৯৩.২০ শতাংশ, সেখানে প্রকল্পভুক্তদের আত্মকর্মসংস্থান হয়েছে ৯৫.২০ শতাংশ। পুরুষদের ক্ষেত্রে এর হার ৬৪.৮০ শতাংশ এবং ৭১.২০ শতাংশ।

এছাড়া ‘আকস্মিক বন্যা ২০১৭:হাওর এলাকার প্রেক্ষাপট’ শীর্ষক আরেকটি জরিপ পরিচালনা করা হয় হাওরবেষ্টিত মৌলভীবাজার, সুনামগঞ্জ, সিলেট, হবিগঞ্জ, নেত্রকোনা ও কিশোরগঞ্জের ৭০ টি গ্রামের ১ হাজার ৮৪৫টি পরিবারের ওপর। ব্র্যাকের গবেষণা ও মূল্যায়ন বিভাগের পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন ইউনিটের সিনিয়র রিসার্চ ফেলো ড. নেপাল চন্দ্র দে-র উপস্থাপনায় এই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, সাধারণভাবে হাওরবাসীদের মধ্যে ৫২ শতাংশ কৃষিতে নিয়োজিত থাকলেও আকস্মিক বন্যায় তা ১৩ শতাংশে নেমে এসেছে। অথচ একই সময়ে মৎস্য চাষে নিয়োজিত হয় প্রায় ২৪ শতাংশ, যা অন্যান্য বছরের তুলনায় সর্বোচ্চ। এছাড়া বন্যার কারণে প্রায় ২১ শতাংশ ছিল একেবারেই বেকার। 

জরিপে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে তিনভাগের এক ভাগ পরিবার দিনে তিনবেলা খাবারের পরিবর্তে দুইবেলা খাবার গ্রহণ করেছে। খাদ্য দুষ্প্রাপ্যতার কারণে এর ৫৩ শতাংশ কম খাবার ও ১৬ শতাংশ কম পুষ্টিকর খাবার খেয়েছে। সামগ্রিকভাবে ওই সময় সেখানকার তিনভাগের এক ভাগ পরিবার খাদ্য সঙ্কটে দিন কাটিয়েছে। গবেষণায় অনুমান করা হয়, এইসব জেলায় কৃষিখাত হিসেবে বিবেচিত শস্য, হাঁস-মুরগি, দুগ্ধজাত পণ্য ও দিন মজুরি -এই চারটিতেই শুধু ক্ষয়-ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২  হাজার ৯১৮ কোটি টাকা।

এতে বন্যার পানি নদী বা খালে দ্রুত নিষ্কাষিত হওয়ার জন্য পুনরায় খনন কার্য এবং উন্নত ড্রেনেজ পদ্ধতি কে গুরুত্ব দিয়ে হাওরবাসীর জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে বেশকিছু সুপারিশ তুলে ধরা হয়। সেগুলি হচ্ছে: বাঁধ সংরক্ষণ ব্যবস্থা উন্নত করা, সময়মত বেড়িবাঁধ মেরামত, সংস্কার ও উপযুক্ত তদারকি, বিভিন্ন হাওর উন্নয়ন প্রকল্পে সরকারের সঙ্গে বেসরকারি সংস্থার সহযোগিতামূলক সম্পর্ক জোরদার,  স্বল্প মেয়াদভিত্তিক বিআরআরআই ধান ৮১, বিআরআরআই ধান ২৮ চাষে চাষীদের উৎসাহিত করা, বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষতা উন্নয়নের ব্যবস্থা করা ইত্যাদি।
অনুষ্ঠানে আনিসুল ইসলাম মাহমুদ বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ব্রহ্মপুত্র ও মেঘনায় পানির উচ্চতা বেড়ে যাওয়ায় আকস্মিক বন্যা হয়েছে। শুধু হাওরে নয়, সারা দেশে এর প্রভাব পড়েছে। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে এটি বড় বাধা। জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবেলায় হাওর অঞ্চলে বোরো ধানের পরিবর্তে কম সময়ে ফলনশীল ধান চাষে কৃষকদের উৎসাহিত করতে আহবান জানান তিনি।

পিটার বগ জেনসেন বলেন, ‘হাওরের বাস্তব পরিস্থিতির আলোকে ব্র্যাকের সমন্বিত মডেল একটি বাস্তবসম্মত উদ্যোগ। এরকম উদ্যোগে অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে কাজ করতে পেরে আমরা আনন্দিত।’

ডা. মুহাম্মাদ মুসা বলেন, ‘এবারের বন্যায় হাওরবাসীর শুধু ফসল নয়, বরং জীবনযাত্রাও অনেকটা পাল্টে দিয়েছে। তাই সমন্বিত উন্নয়ন কর্মসূচিকে দীর্ঘ সময় চালিয়ে নেওয়ার উপর গুরুত্ব দিচ্ছি।’

উল্লেখ্য, ব্র্যাকের সমন্বিত উন্নয়ন কর্মসূচি স্বাস্থ্য, পুষ্টি ও জনসংখ্যা, শিক্ষা, সামাজিক ক্ষমতায়ন, মানবাধিকার ও আইন সহায়তা, নিরাপদ অভিবাসন, জেন্ডার সমতা, নিরাপদ পানি ও সেনিটেশন, অতিদরিদ্রদের জন্য বিশেষ উদ্যোগ, ক্ষুদ্র ঋণ এবং  কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তায় কাজ করছে। 

আমাদের কর্মস্থল

                

ব্র্যাক কুইজ

কোনটি দারিদ্র্য দূরীকরনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি কার্যকরী?

বিকল্প যোগাযোগ পন্থা